কেন তিনি চাণক্য!

খোঁজখবর, ওয়েবডেস্ক : একদা তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড মুকুল রায় বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠে আসে ঘাসফুল শিবিরের এই চাণক্য পদ্ম শিবিরে যাওয়ার পর কতটা সফল হবেন বাংলায় গেরুয়া প্লাবন আনতে । সেই দিক থেকে দেখতে গেলে মুকুল তাঁর ভূমিকায় ১০০ শতাংশ সফল। নীরবে অর্জুন সিং, সৌমিত্র খাঁ দের বিজেপিতে টেনেছেন। যার ফসল এই লোকসভা নির্বাচনে সুদে আসলে তুলে নিল বিজেপি। আসলে জহুরির রত্ন চিনতে ভুল হয়না তাই মোদী – শাহরা চেয়েছিলেন মুকুল বিজেপিতে এলে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা অনেক সহজ হবে । হয়েছেও তাই জোড়া ফুলের ভোট ব্যাঙ্কে ধস নামিয়েছে পদ্ম। কে বলতে পারে নেপথ্যে হয়ত এখন তৃণমূলের এই ভরাডুবি দেখে হাসছেন মুকুল।
একটা সময় ছিল যখন তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব চরমে উঠেছে সেই সময় নিজাম প্যালেসে মুকুলের নিয়মিত দেখা মিলত। সাংবাদিকদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা দিলেও সেই আড্ডায় ক্যামেরার প্রবেশ ছিল নৈব নৈব চ। চা এর সঙ্গে টা সহযোগে চলত সেই আড্ড। সেই সাংবাদিক জটলায় বা বলা ভাল আড্ডায় মুকুল রায় বারবার বলতেন তিনি ধরে খেলায় বিশ্বাসী। ক্রিযে টিকে থাকলেই যে রান আসবে এই সমীকরনে আস্থাশীল ছিলেন তিনি। হয়েছেও তাই যে বিজেপি এক সময় আওয়াজ তুলেছিল ” ভাগ মুকুল ভাগ” সেই মুকুল আজ গেরুয়া শিবিরের অন্যতম সম্পদ। বাংলায় পদ্ম ফোটবার অন্যতম কারিগর তিনি। মুকুলকে একেবারে কাছ থেকে দেখা রাজনৈতিক সহচররা বলেন ” দাদার মতন বরফ ঠান্ডা মাথা পাওয়া বিরল” মুকুলের মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই অন্তরে কি চলছে। আরও একটি বিরল গুণ হল নাড়ি বোঝার ক্ষমতা। সংগঠনকে চেনেন হাতের তালুর মত। তাই ২০১১ সালে মেঘের আড়ালে মেঘনাদের মতই পরিবর্তনের কান্ডারী হয়েছিলেন। তবে গদ্দার শব্দটি বোধহয় অন্তরে তীব্র জ্বালা ধরিয়েছিল তাই মুখে কিছু না বললেও একটা সুযোগেই বুঝিয়ে দিলেন কেন তিনি চাণক্য। মুকুল যে আছেন মুকুলেই ” কাঁচরাপাড়ার কাঁচা” ছেলে বুঝিয়ে দিলেন আসল খেলা কিন্তু ময়দানেই হয় ।

আসলে নির্বাচনী লড়াইয়ে তাঁর ভূমিকা পশ্চিমবঙ্গে প্রয়াত বাম নেতা অনিল বিশ্বাসের সমতুল্য৷ অনিলবাবুর প্রয়াণের পর বামেদের নির্বাচনী রণকৌশলে যে খরা দেখা গিয়েছে তাতে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হয়েছে এক সময়ের শাসক পক্ষের৷ আর ২০১১ সালে পরিবর্তনের পর তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনকে ধরে রাখতে মুকুল রায় ছিলেন স্তম্ভের মতো৷

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়ের ছায়াসঙ্গী মুকুল রায় এখন দিদির পাশে নেই৷ তিনি দল পরিবর্তন করার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সংগঠনের ছায়া লম্বা হতে শুরু করে৷ সেই ছায়া যে একেবারে মমতার মাথায় এসে পড়তে চলেছে তার প্রমাণ হাতে কলমে মিলে গেল সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে।

নিন্দুকেরা বলে, সারদা-নারদা থেকে বাঁচতে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন একসময়ের তৃণমূল কংগ্রেসের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মুকুল রায়। বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় দলের নেতৃত্বস্থানীয়রা শুধু নন, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাম না করে “গদ্দার” বলে চিহ্নিত করেছেন তাঁকে। এবং কলকাতা প্রেস ক্লাবে মিট দ্য প্রেসে মুকুল রায়ের মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করাতে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় অবজ্ঞার ছলে প্রশ্নই শোনেন নি। বৃহস্পতিবার লোকসভার ফল বেরনোর দিনে সেই মুকুল রায়ের চোখেমুখে আত্মবিশ্বাসের ছাপ। তবে চোয়াল শক্ত, মুখ যেন আরও সংযত। তাঁর কাজ এখনও বাকি।

বৃহস্পতিবার দিল্লি থেকে ফিরে কলকাতায় বিজেপির রাজ্য দপ্তরে যান মুকুল রায়। বিজেপির ভাল ফলের পরও ভিক্টরি সিম্বল দেখান নি তিনি। স্রেফ বলেন, “এখনও সব ফল প্রকাশ হয় নি।” দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর, হাজারো কটূক্তি শোনার পরও নিজের লক্ষ্যে অটল মুকুল। তাঁর মুখ বলছে এই ফল নয়, তাঁর নিশানা আরও দূরে। সংবাদ মাধ্যমে তিনি এদিন বলেই ফেলেন, তৃণমূল কংগ্রেসকে তুলে দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য। তবে এও তিনি স্বীকার করেছেন, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব সকলে মিলে এক যোগে লড়াই করেই লোকসভা নির্বাচনে সাফল্য এনেছেন।

সারদা-কাণ্ডে সিবিআই মুকুল রায়কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তিনি তখন বলেছিলেন তদন্তে সহযোগিতা করবেন। সেই শুরু তৃণমূল সুপ্রিমোর সঙ্গে সংঘাত। তার শেষ বিজেপিতে যোগ দিয়ে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, তৃণমূল কংগ্রেসের মূল সেনাপতিকে দলে নিয়ে পদ্ম শিবির যে ভুল করে নি, বৃহস্পতিবারের ফলই তার প্রমাণ। তিনি নিজে প্রার্থী করেছিলেন বিষ্ণপুরের সৌমিত্র খাঁ, কোচবিহারের নিশীথ প্রামাণিকদের। এঁরাও আজ জয় পেয়েছেন। বাংলার রাজনীতির চাণক্য তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতির রণকৌশল সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। তাই বিজেপির তৃণমূলের সঙ্গে লড়াই করা সহজ হয়েছে। নিজের দুর্দিনে মুকুল বলতেন, ক্রিজে থাকলে রান মিলবে। তা আরো একবার প্রমাণ করে দিলেন মুকুল রায়।

লোকসভা নির্বাচনে এই রাজ্যে সমানতালে প্রচার করেছেন নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ। বিজেপিও বছরভর কর্মসূচি পালন করেছে। কিন্তু সেই তরকারিতে নুনের কাজ করেছে মুকুলের রাজনৈতিক কৌশল। রাজনৈতিক মহল মনে করে, কোন আসনে কার সঙ্গে গোপন বৈঠক করলে দলের লাভ হবে, তা মুকুলের চেয়ে ভাল কেউ জানেন না। তৃণমূল কংগ্রেসের কারা গোপনে বিজেপিকে সাহায্য করবেন তাও বিলক্ষণ জানতেন মুকুল। এসবই বাড়তি সুবিধা দিয়েছে পদ্ম শিবিরকে। তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তৃণমূল বিধায়করা দলে দলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, তা আগেই জানিয়েছিলেন তিনি। এবার দেখার বিষয়, বাংলার মসনদ দখলে কি কৌশল নেন এই চাণক্য। যে সয় সেই রয় এই আপ্তবাক্যটা আরও একবার মিলিয়ে দিলেন মুকুল। লোকসভায় নজিরবিহীণ সাফল্যের পরেই যে তাঁর কাজ শেষ হয়ে যায়নি । ২০২১ সালে যে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন আরও বড় টার্গেটের সামনে দাঁড়িয়ে এখন অস্ত্র শানাচ্ছেন মুকুল।