রাজ্যে বহমান হিংসাত্মক আন্দোলনের ধারা !

খোঁজখবর, ওয়েবডেস্ক : এনআরএসে সোমবার থেকে জুনিয়র চিকিৎসক নিগ্রহের বিরুদ্ধে চলা আন্দোলন এখন সর্বভারতীয় চেহারা নিয়েছে,আন্দোলনের আতুঁরঘর সেই বাংলা থুরি কলকাতা। আসলে বাংলার এই আন্দোলন বা বলা ভাল তার রাজনৈতিক পরিমার্জন কোন নতুন ঘটনা নয়। নিরাপত্তার দাবিতে যে কর্মবিরতি জুনিয়র চিকিৎসকরা শুরু করেছিলেন তা ক্রমশ ধূমায়িত হয়েছে। তাতে রাজনীতির প্রলেপ লেগেছে। আসলে বাংলায় একটা প্রবাদ বহুদিন ধরেই চালু আছে সেটা হল ” রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় উলুখাগড়ার প্রাণ যায়”, আজ যখন মাত্র তিনদিন বয়সী শিশু পুত্র কে হারিয়ে শোকে পাগল বাবা, মা প্রশ্ন তোলেন “আমার ছেলেটার কি দোষ ছিল, ও কেন অকালে চলে গেল সামান্য চিকিৎসাটুকু না পেয়ে তখন আমাদের হয়ত মাথা নীচু করা ছাড়া কোন উপায় থাকেনা। তবে আমাদের রাজ্যে এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট কোন নতুন ঘটনা বা প্রেক্ষিত নয়। খাদ্য আন্দোলন, এক পয়সা ভাড়া বাড়ানোর জন্য ট্রাম পোড়ানো, নকশাল আন্দোলন কত কিছুই না আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।

অবশ্য আমাদের রাজ্যে হিংসাত্মক ঘটনাবলির এই আধিক্য কিন্তু হঠাৎ করে হয়নি। এই ঐতিহ্য সমানে চলছে। আমরা রাজ্যবাসীরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক বলে ঢাক পেটাই। কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা আমাদের এই বঙ্গদেশেও তো কম কিছু হয়নি। ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার যে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল কলকাতা এবং নোয়াখালিতে, তা অবশ্যই বাঙালির পক্ষে লজ্জাজনক। ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসের ১৬ তারিখ ডায়রেক্ট অ্যাকশন ডে’র নামে যে দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল, তাতে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। আহত হয়েছিলেন বহু মানুষ। লক্ষাধিক মানুষকে ঘরছাড়া হতে হয়েছিল। সেই বছরই অক্টোবর মাসে বীভৎস দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল পূর্ববঙ্গের নোয়াখালিতে। সেখানেও পাঁচ হাজারের বেশিসংখ্যক মানুষের জীবনহানি হয়েছিল। ঘরছাড়া হন লাখো মানুষ। অবশ্য তা স্বাধীনতার আগের কথা।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও আমাদের পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও অন্যান্য হিংসার ঘটনা নেহাত কিছু কম হয়নি। বামপন্থীদের খাদ্য আন্দোলনের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন অনেকে। আবার আন্দোলনের নামে ট্রাম-বাস পোড়ানো হয়েছে অনেক। এটাও হিংসাত্মক রাজনীতি। ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে যুক্তফ্রন্ট। সেই যুক্তফ্রন্টে সিপিআইএম-এর দাপট ছিল বেশি। সেই আমলেই শুরু হয় হিংসাত্মক নকশালবাড়ি আন্দোলন। ১৯৬৯ সালে ক্ষমতায় আসে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট। তখন নকশালবাড়ি আন্দোলন রীতিমতো তুঙ্গে। একদিকে সিপিআইএম, একদিকে কংগ্রেস, একদিকে নকশালপন্থীরা। এই বাংলার তখন রীতিমতো বেহাল অবস্থা। এই সময়টা যাঁরা প্রত্যক্ষ করেননি, তাঁরা বুঝে উঠতে পারবেন না যে সামগ্রিক পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল। আজকের প্রজন্ম তা জানলেও সেদিনের যারা তরুণ ছিলেন আজ যাঁরা প্রবীণ তাঁদের স্মৃতিতে আজও উজ্বল নকশাল আন্দোলনের কালো দিনগুলির কথা। ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন লাগু হয়। এর আগে ১৯৬৮ সালেও এ রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি ছিল কিছুদিনের জন্য। রীতিমতো টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল সেই সময়কাল জুড়ে।

১৯৭২ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত হয় রাজ্য বিধানসভা নির্বাচন। রীতিমতো গা-জোয়ারি করে, অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনিয়ে-দেখিয়ে আসলে সেবার নির্বাচনের নামে বিশাল প্রহসনই হয়েছিল। আবার রাষ্ট্রপতি শাসনকালে এবং পরবর্তীতে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের শাসনকালে এ রাজ্যে নকশাল আন্দোলন দমনের নামে যে পথ অবলম্বন করা হয়েছিল, তাতে রীতিমতো শিউরে উঠতে হয়েছিল রাজ্যবাসীকে। অবশ্য নকশালপন্থীদের হাতেও কম কিছু খুনখারাপির ঘটনা ঘটেনি। আমাদের রাজ্যে সেই খুনোখুনির রাজনীতির ইতিহাস সত্যিই ভয়াবহ। এরপর ১৯৭৫ সালে সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধি। সেই সুবাদেও রাজনৈতিক অত্যাচারের ঘটনাও কিছু কম নয়।

১৯৭৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন জিতে এ রাজ্যে সিপিএমের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। ৩৪ বছরের বাম আমলেও বহু রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা ঘটেছে আমাদের রাজ্যে। কলকাতায় বিজন সেতুর ওপর ১৯৮২ সালের ৩০ এপ্রিল জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয় ১৬ জন আনন্দমার্গী সন্ন্যাসী ও একজন সন্ন্যাসিনীকে। ১৯৭৯ সালে মরিচঝাঁপিতে বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের উচ্ছেদ করতে বামফ্রন্টের পুলিশ যে নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছিল সেটাও ছিল অভাবনীয়। পরবর্তীকালেও বাম শাসন চলাকালীন হিংসাত্মক ঘটনাবলি ঘটেছে অনেকই। নেতাই-এর ঘটনা, সিঙ্গুরের ঘটনা, নন্দীগ্রামের ঘটনা ভুলে যাবার কথা নয় কারও।

শেষমেশ পরিবর্তন তো ঘটল ২০১১ সালে। এমনটা যেন হবারই ছিল। ৩৪ বছরের বাম জামানাকে ধূলিস্যাত করে ক্ষমতায় এল তৃণমূল কংগ্রেস। সাধারণ মানুষের অনেকটাই ভরসা ছিল তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর। কিন্তু সেই আস্থা, সেই বিশ্বাস, সেই ভরসাক্ষেত্রে ধীরে হলেও কি ভাঙন দেখা দিয়েছে প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা! পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় ধরে গণতন্ত্র যেভাবে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে শাসকদলের দৌরাত্মে, তা রীতিমতো অভাবনীয়। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে অভাবনীয় ভালো ফল করেছে গেরুয়া শিবির। ১৮ টা আসন পেয়েছে তারা।
আজও সেই ট্রাডিশ্যান বহমান। নির্বাচনের ফলাফল বের হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক হিংসার বলি প্রাণ হারানোর ঘটনাও কম দেখলোনা রাজ্যবাসি। খুব সম্প্রতি সন্দেশখালির ঘটনায় সেই চাপানউতোর আরও বেড়েছে। এনআরএসের জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতি থেকে শুরু হওয়া থেকে ক্রমবর্ধমান ঘটনা পরম্পরা হয়ত তারই নীরব সাক্ষী।