নোটার ভোট, ভোটের নোটা !

খোঁজখবর, ওয়েবডেস্কঃ ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে দেশজুড়ে ৬৫ লক্ষেরও বেশি ভোটার নোটায় -য় ভোট দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রার্থীর প্রতি আস্থা না দেখিয়ে নোটার অপশনে ভোট দিয়েছে ৬৫,১৪, ৫৫৮ জন।২০১৩-র সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল ভোট দিতে গিয়ে কোন প্রার্থীকে পছন্দ না হলে সেটা ঘটা করে জানানোর একটা সুযোগ দিতে হবে ভোটারদের। ফলশ্রুতিতে ইভিএম-এর শেষ বোতামটা নির্দিষ্ট হয়ে গেল এর জন্য।

ভেবে দেখুন পাঠকরা ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, দল-নির্বিশেষে, নির্বাচকদের কাছে আর্জি জানিয়েছেন, ইভিএম-এ ‘নোটা’-র বোতাম টিপে ভোটটি ‘নষ্ট’ যাতে না করা হয়, সে জন্য। তার মানে, ‘নোটা’ নিয়ে প্রথম প্রথম রাজনীতিবিদদেরও কোথাও একটা সন্দেহ নির্ঘাৎ ছিল। হয়তো বা ত্রাসও ছিল খানিক। কে জানে কার ভোটে ভাগ বসায়? তার অল্প আগেই, কী আশ্চর্য, ২০১৯-এর ভোটের আগে কোনও রাজনৈতিক নেতার মুখেই নোটাতঙ্কের কথা সেভাবে শোনা যায়নি।
কারও মনে হতে পারে যে তাঁর কেন্দ্রের কোনও রাজনৈতিক দল কিংবা প্রার্থীই তাঁর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি সুবিচার করতে পারবে না। কাউকে ভোট দেওয়াটাই তাই সঙ্গত নয়। ভোটার বাড়িতে থেকেও একই কাজটা করতে পারেন। কিন্তু দস্তুরমতো ভোটকেন্দ্রে এসে ‘নোটা’-য় বোতাম টেপার মধ্যে একটা স্পর্ধিত অভিব্যক্তি রয়েছে। রয়েছে রাজনীতিকদের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনের এক নীরব অথচ সোচ্চার প্রকাশ। এর একটা অন্য দিকও রয়েছে। কোনও প্রার্থীকে ভোট দিতে ইচ্ছে না হলেও, ভোট না দিয়ে বাড়িতে বসে থাকার মধ্যেও বিপদ থাকতে পারে। কারণ তাতে এই অনাস্থাটা সর্বসমক্ষে অনাবৃত হয়ে পড়ে। ‘নোটা’-র বোতামটা অনাস্থা প্রকাশের সুযোগের সঙ্গে দেয় কাঙ্ক্ষিত গোপনীয়তা এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিরাপত্তাও। আমি কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থা বা শ্রদ্ধাশীল না হতেই পারি তবে ভোট দিতে না যাওয়ার মধ্যে যেন কোথাও একটা সোচ্চার বিরোধতা আছে ভোট মিটে গেলে তার আশু প্রভাব ভালো না হতেও পারে কি দরকার বাবা তার চেয়ে চুপচাপ গিয়ে নোটায় ছাপ মারাটাই অনেক শ্রেয়।

ব্রাজিল, স্পেন, ইন্দোনেশিয়া, চিলি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, কলম্বিয়া, ইউক্রেন, সুইডেন, গ্রিস—- নানা দেশে ‘নোটা’-র ব্যবস্থা রয়েছে নানা ভাবে। দেশভেদে এর নাম-রূপও খানিকটা আলাদা। কোথাও ‘সবার বিরুদ্ধে’ (এগেইনস্ট অল), কোথাও আবার ‘কেটে দেওয়া ভোট’ (স্ক্র্যাচ্ ভোট), আবার কখনও বা ‘শূন্য ব্যালট’ (ব্ল্যাঙ্ক ব্যালট)। ভারতে ‘নোটা’-র সমর্থনের পারদ কিন্তু মোটামুটি আটকে আছে ১-২%-এর মধ্যে। অঞ্চলভেদে যদিও এই সমর্থনটাও বদলে যায় অনেকটাই। ২০১৫-র বিহার বিধানসভার নির্বাচনে ‘নোটা’ পেয়েছিল ২.৪৮% সমর্থন। সে বছরই দিল্লি বিধানসভায় ‘নোটা’-র সমর্থন মাত্র ০.৪০%। ২০১৪-র লোকসভায় ৬০ লক্ষ মানুষ ভোট দিয়েছেন ‘নোটা’-তে। প্রায় ১.১%। হিসেব বলছে যে কোনও নির্বাচনে মোটের উপর ৮-১০% আসনে ‘নোটা’ ভোটের পরিমাণ বিজয়ী এবং দ্বিতীয় স্থানাধিকারীর ভোটের ব্যবধানের চাইতে বেশি হয়। এ নিয়ে মিডিয়ায় হইচইও হয়। প্রতিটা রাজ্যের প্রত্যেকটা ভোটের পরে। তবে, এমন তো নয় যে ‘নোটা’ না থাকলে এই ভোটগুলি সব দ্বিতীয় স্থানাধিকারীর ঘরে ঢুকতো। ‘নোটা’ না থাকলে এদের কেউ হয়তো ভোটই দিতেন না। বাকিদের ভোটগুলি হয়তো ভাগ হয়ে যেত বিভিন্ন প্রার্থীর মধ্যে।
নোটা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষন যতই চলতে থাকুক না কেন নিন্দুকদের মুখে থুড়ি বিরোধীদের মুখে ছাই দিয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসছে বিজেপি। ভারতের ভোট ব্যবস্থায় নোটা যে বেশ প্রাসঙ্গিক ভূমিকা পালন করে আসছে আম ভোটারের জীবনে সে কথা বলাই বাহুল্য।