ভারতীয় রাজনীতির পিকের হাতেই এবার জোড়াফুলের রণকৌশল !

খোঁজখবর, ওয়েবডেস্ক: লোকসভা ভোটে রাজ্যে নজিরবিহীন ধাক্কা খাওয়ার পর নির্বাচনী কৌশলী বা ইলেকশন স্ট্রাটেজি মেকার প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নবান্নে প্রশান্তের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে বৈঠকও করেন মুখ্যমন্ত্রী। সূত্রের খবর, এক মাস পর থেকে মমতার সঙ্গে কাজ শুরু করবেন প্রশান্ত কিশোর।

লোকসভা ভোটে ১৮টি আসনে জেতার পর বাংলায় স্বভাবিক ভাবেই ব্যাপক উত্থান হয়েছে বিজেপির । তৃণমূল ছেড়ে বহু নেতা-কর্মী যোগ দিচ্ছেন গেরুয়া শিবিরে। এহেন পরিস্থিতিতে ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে কঠিন লড়াই। সেই লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রথের রশি ধরতে চলেছেন এককালে মোদীর নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজিস্ট প্রশান্ত কিশোর। ।সূত্রের খবর, এক মাস পর থেকে কাজ শুরু করে দেবেন প্রশান্ত কিশোর।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্নওঠা স্বাভাবিক কে এই প্রশান্ত কিশোর যাকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃ্ত্বের এত মাথাব্যাথা। ২০১৪ সালে ‘অচ্ছে দিন’-এর স্লোগান দিয়ে গোটা দেশে ‘ব্র্যান্ড মোদী’র উত্থান। আর মোদীর ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ভাবমূর্তি তৈরির নেপথ্যে ছিলেন প্রশান্ত কিশোর। ২০১৪ সালে তিনিই ছিলেন মোদীর নির্বাচনী কৌশলী। হিরে চিনতে ভুল হয়নি নরেন্দ্র মোদীর। নির্বাচনী ফলাফলেই তা স্পষ্ট হয়েছে। এরপর নীতীশ কুমারের সঙ্গে কাজ করেন প্রশান্ত। প্রবল মোদী ঝড় বিহারে রুখে দিতে সমর্থ হয়েছিল মহাজোট। তাঁকে বিহারের ক্যাবিনেট পদমর্যাদাও দিয়েছিলেন নীতীশ। কিন্তু বিজেপির আপত্তিতে সেই পদে বেশিদিন থাকতে পারেননি প্রশান্ত।

সদ্য অন্ধ্রপ্রদেশে চন্দ্রবাবুর দলকে কুপোকাত করেছেন জগন্মোহন রেড্ডি। বিধানসভা ভোটে ১৭৫টি আসনের মধ্যে ১৫০টিই জিতেছে ওয়াইএসআর কংগ্রেস। আর জগন্মোহনের নির্বাচনী স্ট্র্যাটেজিস্ট ছিলেন প্রশান্ত কিশোর। সেই প্রশান্ত কিশোরই এবার মমতার স্ট্র্যাটেজিস্ট।সাফল্যের মধ্যে প্রশান্তের ব্যর্থতা নেই, এমনটা নয়। উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোটে প্রশান্তকে কাজে লাগিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। কিন্তু সেখানে মুখ থুবড়ে পড়েছিল সপা-কংগ্রেস জোট। তবে বাংলার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে পেশাদার রণনীতিকার নিয়োগের সিদ্ধান্ত বেনজির বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
কোনও রাজনৈতিক দলের ভোট পরিচালনার কৌশল ঠিক করে দেওয়া এবং প্রচার-পর্বকে সেই ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পেশাদারি দক্ষতা আছে প্রশান্ত কিশোরের। ২০১৪ সালে দেশে নরেন্দ্র মোদী, ২০১৫ সালে বিহারে নীতীশ কুমার, ২০১৭ সালে পঞ্জাবে অমরিন্দর সিংহ এবং সর্বশেষ ২০১৯-এ অন্ধ্রপ্রদেশে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে জগন্মোহন রেড্ডির দলের জয়— প্রতিটির নেপথ্যেই ছিল তাঁর ভূমিকা। পদ্ম শিবিরের এহেন উঠে আসায় আক্ষরিক ভাবেই জোড়া ফুল শিবিরে এখন খোঁজ পড়েছে রণনীতি মেকারের ।
কিন্তু কে এই প্রশান্ত কিশোর? তাঁর সাফল্যের রসায়নই বা কী? দেশের রাজনৈতিক মহলে তিনি পরিচিত পিকে নামেই। ধুরন্ধর মস্তিষ্ক প্রশান্তের, গতিপ্রকৃতি বা জনগনের নাড়ি বুঝতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। এমনটাই বলেন পিকে কে কাছ থেকে দেখা লোকজনেরা। জন্ম বিহারের রোহতাস জেলার কোরান গ্রামে। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর তাঁর বাবা পাকাপাকি ভাবে চলে যান বিহারেরই বক্সারে। অন্য দিকে ইঞ্জিনয়ারিং পড়তে হায়দরাবাদে যান প্রশান্ত। পড়াশোনার পাঠ চোকানোর পর কাজে যোগ দেন রাষ্ট্রপুঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগে। কর্মস্থল ছিল আফ্রিকা। আট বছর চাকরির পর ২০১১ সালে ফিরে আসেন দেশে। তৈরি করেন নিজের সংস্থা সিটিজেন্স ফর অ্যাকাউন্টেবল গভর্নমেন্ট (সিএজি)। নিজের সংস্থায় নিয়োগ করেন আইআইটি-আইআইএম-এর পেশাদার লোকজনকে। পরের বছরই বিধানসভার ভোট গুজরাতে। ভোটের রণকৌশল তৈরি করতে এই প্রশান্ত কিশোরকেই নিয়োগ করেন তখনকার গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

‘পিকে’র কাজটা সহজ ছিল না। কারণ ২০০১ সাল থেকে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। উন্নয়ন হলেও দীর্ঘদিন সরকারে থাকায় প্রশাসন বিরোধী হাওয়া ছিল। কিন্তু মোদীর সেই উন্নয়নের সঙ্গে ঐক্যের বার্তা জুড়ে ব্যাপক প্রচার-কৌশল রচনা করেন প্রশান্ত। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে গোটা গুজরাত জুড়ে প্রচারের এমন কৌশল তৈরি হয়, যাতে ফের ক্ষমতায় আসতে অসুবিধা হয়নি মোদীর। সেই সাফল্যের হাত ধরেই প্রশান্ত পান আরও বড় দায়িত্ব। গুজরাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে জাতীয় স্তরে নিজেকে তুলে ধরার দায়িত্বও তাঁর কাঁধেই সঁপে দেন মোদী। তার পরই তৈরি হয় ‘ব্লু প্রিন্ট’। মনে রাখা দরকার সারা দ্বেশে তোলপাড় তোলা বেরোয় ‘চায়ে পে চর্চা’, সেই সময়ই প্রশান্তের মস্তিষ্ক থেকে বেরোয় ছিল ‘রান ফর ইউনিটি’র মতো ‘মাস্টার স্ট্রোক’। আর সেই সবের হাত ধরেই দেশ জুড়ে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মোদী। ফল ২০১৪ সালে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদে উত্তরণ।

কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর দলের মধ্যেই শুরু হয় সঙ্ঘাত। মূলত অমিত শাহ এবং দলের আরও কয়েকজন নেতার সঙ্গে মনোমালিন্যে মোদীর ‘সঙ্গ’ ছাড়েন প্রশান্ত। সেই সময়ই নিজের সংস্থা সিএজি পরিবর্তন করে গড়ে তোলেন ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (আইপিএসি)। মার্কিন মুলুকের কানাডার সংস্থা পিএসির অনুকরণে নিজের সংস্থার নামকরণ করেন প্রশান্ত। মার্কিন মুলুকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের ভোটপ্রচার এবং রণকৌশল তৈরির পেশাদার কাজ করে এই সংস্থা।

এর মধ্যেই ২০১৫ সালের গোড়ায় যোগ দেন নীতীশ কুমারের রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে। ওই বছরই বিহার বিধানসভার ভোট। জনতা পরিবার এবং কংগ্রেস মিলে মহাজোট তৈরি করে ভোটে লড়ে। তাতে বিপুল সাফল্য পায় মহাজোট। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী হন নীতীশ কুমার। নীতীশের ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা যায়, ওই সময় অঞ্চলভিত্তিক ভাগ করে সেখানকার সমস্যা বুঝে নীতীশের বক্তব্যের বয়ান তৈরি করে দিতেন প্রশান্ত। তাতে এলাকাবাসীও মনে করতেন তাঁদের কথাই বলতেন নীতীশ। নীতীশকে প্রায় সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেওয়ার জেরে এই সময়ই মূলত প্রচারের আলোয় আসেন প্রশান্ত। তার পরও নীতীশের উপদেষ্টা হিসেবে বেশ কিছু জনমুখী পরিকল্পনার রূপায়ন হয় তাঁর হাত ধরেই।

নীতীশের জেডিইউ-এর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ না করেও এ বার প্রশান্তের হাত ধরে কংগ্রেস। প্রথমেই দায়িত্ব পান ২০১৬ সালের পঞ্জাব বিধানসভা নির্বাচনের। তার আগের দু’টি নির্বাচনে হেরে কার্যত খাদের কিনারে কংগ্রেস। সেখান থেকে তুলে এনে ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিংহের জয় নিশ্চিত করার কারিগর ছিলেন এই ‘পিকে’ই।

পরের বছরই উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার ভোট। আবার দায়িত্বে প্রশান্ত কিশোর। কেরিয়ারের প্রথম এবং একমাত্র ধাক্কা প্রশান্ত খেয়েছেন গোবলয়ের এই রাজ্যেই। কংগ্রেসের রাজনৈতিক কৌশল তৈরি করলেও তাঁর সেই রণনীতি পুরোপুরি ফ্লপ হয়। মাত্র সাতটি আসন পায় কংগ্রেস। প্রতিপক্ষ শিবিরে তিনশোরও বেশি আসন নিয়ে উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। রাজনৈতিক শিবিরে কান পাতলেই অবশ্য শোনা যায়, ওই সময়ই প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিয়ে আসার প্রস্তাব দেন পিকে। কিন্তু প্রিয়াঙ্কাএবং কংগ্রেস রাজি হয়নি। প্রিয়াঙ্কা সেই সময় এলে কংগ্রেসের ফল কী হত, সেটা অন্য কথা। কিন্তু ব্যর্থতা ব্যর্থতাই তাই তাকে মানতেই হবে।
কিন্তু প্রশান্তের এই সাফল্যের রসায়ন কী? কার্যত প্রতিটি বুথ ধরে সমীক্ষা করে সেখানকার সমস্যা জেনে নেওয়া এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, পেশাদারদের দিয়ে অভিনব প্রচার ও রাজনৈতিক কর্মসূচি তৈরি করা এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা রূপায়ণের পন্থা বাতলে দেওয়া। এর সঙ্গে পক্ষের এবং বিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা বুঝে সেই অনুযায়ী ঘুঁটি সাজানো। এর সঙ্গে বিভিন্ন রকম সমীকরণ নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে তার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা, এবং খামতি দূর করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়ার পরিকল্পনা করাও প্রশান্তের সাফল্যের চাবিকাঠি। গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থেকে দেশের দুবারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এই উত্তরনের সিংহভাগ কৃতিত্ব কিন্ত টিম পিকে ওরফে প্রশান্তের। মেঘের আড়ালে মেঘনাদের মত থেকেই নিজের রণনীতি সাজান এই কৌশল নির্মাতা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে ২০২১- এ গড় সামলাতে কিন্তু প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষে পদ্মের দারস্থ হতেই হল জোড়াফুলকে।