ফণী ও প্রশাসন !

খোঁজখবর, ওয়েবডেস্ক: প্রকৃতির রোষ ঠেকানোর ক্ষমতা আজও মানুষের নেই। ঝড়ঝঞ্ঝা, বজ্র-বিদ্যুৎ, ভূমিকম্প, জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দাপটের কাছে সত্যি বলতে কী—মানুষ অসহায়। অবশ্য, আধুনিককালে বিজ্ঞানের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মানুষ প্রকৃতির ওই তাণ্ডবের হাত থেকে আত্মরক্ষার অনেক কলাকৌশলও আয়ত্ত করেছে। তার জোরেই প্রকৃতির দাপট ঠেকাতে না পারুক প্রাণহানি বহুলাংশেই ঠেকাতে সক্ষম হয়েছে। সেই সঙ্গে ঘরবাড়ি সংসার-সম্পত্তি গাই-বাছুর খেতখামারের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা রোধ করার শক্তি অর্জন করেছে। এখন প্রকৃতির চলনবলন, হাবভাবে মানুষের বিপদ বিপর্যয় ঘটানোর কিছুমাত্র সম্ভাবনা দেখা দিলেই আমাদের আবহাওয়াবিদেরা উপগ্রহ চিত্র বা অন্যান্য অত্যাধুনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তার আগাম খবর পেয়ে যাচ্ছেন। এবং কখন কোথায় সে বিপদ ঘটবে বা ঘটতে পারে তার প্রায় নির্ভুল তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরগুলোতে সরবরাহ করছেন। তার ফলে বিপর্যয় মোকাবিলার সঙ্গে যুক্ত দপ্তরগুলো যেমন প্রাকৃতিক তাণ্ডবের মোকাবিলায় প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময় পেয়ে যাচ্ছে তেমনি সাধারণ মানুষও বিপদ ব্যাপারে আগাম সতর্ক হতে পারছে।
তবে নানাবিধ উপগ্রহ চিত্রের শরনাপন্ন হয়ে ক্ষয়ক্ষতি হলেও বিস্তর হলেও প্রাণহানিকে অনেকাংশেই রুখে দেওয়া যাচ্ছে। খুব সম্প্রতি ওড়িশা উপকূলে আছড়ে পড়া কালান্তর ঘূর্ণীঝড় ফণীর কবলে পড়ে ড়িশায় মাত্র আট হতভাগ্যের প্রাণ নিয়েই এ যাত্রায় ফণীকে বিদায় নিতে হল। অথচ, এর আগে এই শতকের শুরুর কয়েক মাস আগে ১৯৯৯ সালের ২৯ অক্টোবর ওড়িশায় যে সুপার সাইক্লোন হয়েছিল তাতে ধ্বংসের ছবি আর মৃত্যুর সংখ্যা প্রকৃত অর্থেই মর্মান্তিক পর্যায়ে পৌঁছেছিল। মৃত্যু ছাড়িয়ে ছিল দশ হাজার, ২৫ লক্ষেরও বেশি মানুষকে গৃহহীন করে ধূলিসাৎ হয়েছিল সাড়ে তিন লাখের মতো বাড়িঘর। এই বিরাট ক্ষয়ক্ষতির কারণ ছিল একটাই—প্রকৃতির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে উপযুক্ত তথ্যের অভাব।
তবে ১৯৯৯ সালের সুপার সাইক্লোনের ক্ষয়ক্ষতি থেকে যে শিক্ষা নিয়েছে ওড়িশা সরকার তা বলাই বাহুল্য। এবার সর্তকবার্তা পাওয়ামাত্রই পুরী থেকে পর্যটকদের সরানোর কাজ শুরু করে দেয় প্রশাসন। পর্যটকদের বিশেষ ট্রেনে বাড়ি ফেরানোর বন্দোবস্ত করা হয়, এমনকি শ্রীক্ষেত্রে প্রভু জগন্নাথের মন্দিরের ধ্বজা ছোট করে দেওয়া হয়। শুধুকি তাই আগাম বন্ধ করে দেওয়া হয় বিমানবন্দর। তবুও পুরোপুরি কি রক্ষা পাওয়া গিয়েছে তান্ডব থেকে , তা হয়ত নয় উপড়ে গিয়েছে মোবাইল টাওয়ার , ভেঙে পড়েছে ক্রেন, অমিল পানীয় জল, বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা তবু তার মধ্যেই আশার কথা প্রাণহানি অনেক কম হয়েছে । তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন সব হিসেব করে দেখলে ক্ষয়ক্ষতির যে ছবি সামনে আসছে তা কিন্তু নিসন্দেহে ১৯৯৯ সালের সুপার সাইক্লোনের থেকে অনেক কম । এবং তার জন্য অবশ্যই প্রশসংনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ ।
এই রাজ্যেও যে ভাবে ফণীর মোকাবিলা করতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃ্ত্বে যে তৎপরতা নেওয়া হয়েছে তার প্রশংসা করছেন আবহবিদরা। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা এটাও বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে ঢুকেও ফণী এবার বিশেষ ক্ষতি করতে পারত না। ফণীর হাওয়ার জোর যদি ঘণ্টায় দেড় দুশো কিলোমিটার থাকত তাহলে ওড়িশার মতো ক্ষয়ক্ষতি হতো ঠিকই তবে প্রাণহানি হতো না। ফণী আসার খবর পাওয়ামাত্র যুদ্ধকালীন তৎপরতায় যেভাবে এবার মমতা-প্রশাসন বিপর্যয় মোকাবিলায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং দীঘা শঙ্করপুর মন্দারমণির মতো রাজ্যের সমুদ্র উপকূলবর্তী পর্যটনকেন্দ্রগুলি থেকে পর্যটকদের নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরত পাঠাবার ব্যবস্থা করেছে, যেভাবে বিপজ্জনক বাড়ি বা এলাকার মানুষজনকে আগেভাগে রেসকিউ সেন্টারে তুলে এনেছে, যেভাবে পুলিস পুরসভা দমকল ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি কোমর বেঁধে ঝড়ের মোকাবিলায় একজোট হয়ে নেমে পড়েছে, তা অনেকের কাছেই রাজ্যে নজিরবিহীন বলে মনে হয়েছে। স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর এই বিপর্যয় মোকাবিলা প্রস্তুতি রাজ্যবাসীর মনে এই আত্মবিশ্বাসটা জাগিয়ে দিয়েছিল যে ঘূর্ণিঝড় ফণী আর যা-ই হোক আয়লার মতো তাঁদের সর্বনাশ করতে পারবে না। কারণ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর প্রশাসনের সর্বাত্মক চেষ্টায় তাঁরা এবার আগেভাগেই সুরক্ষিত এবং সচেতন। আসলে ক্ষয়ক্ষতি হয়ে গেলে ক্ষতিপূরণ নয় বরং তার আগেই ক্ষতিটাকে রুখে দেওয়া যায়! সেই ফর্মুলাতেই পথ চলে পুরোপরি সফল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসন