ফুল নয়, যেন আগুনের ফুলকি…

    0
    171

                                                

                        ফুল নয়, যেন আগুনের ফুলকি…

                                       সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১২.০২.১৯১৯ – ০৮.০৭.২০০৩)

     

    মৌনী মন্ডল :   তিনি(সুভাষ মুখোপাধ্যায়) বলেছিলেন, ‘ফুলের ওপর কোনো দিনই আমার টান নেই/তার চেয়ে আমার পছন্দ আগুনের ফুলকি-/যা দিয়ে কোনো দিন কারো মুখোশ হয়না।’ প্রকৃতই তাঁর আজীবন সাহিত্যকর্মে তিনি একথাই যেন বারবার উচ্চারণ করেছেন। কবির জন্মশতবর্ষে শুধুই তাঁর স্মৃতি-উদযাপন নয় বরং তাঁর নিপট বিবেচনা পাঠকের কাছে সশ্রদ্ধ নিবেদনই আমার লেখনীর অভিমতি।

    বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভারতীয় বাঙালি  কবি ও গদ্যকার ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়কবিতা তাঁর প্রধান সাহিত্যক্ষেত্র হলেও ছড়া, ভ্রমণসাহিত্য, অর্থনীতিমূলক রচনা, বিদেশি গ্রন্থের অনুবাদ, কবিতা সম্পর্কিত আলোচনা, উপন্যাস, জীবনী, শিশু ও কিশোর সাহিত্য সকল প্রকার রচনাতেই তিনি ছিলেন উদাত্ত। সম্পাদনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ এবং বহু দেশি-বিদেশি কবিতা। তাঁর কবিতা চড়া সুরে বাঁধা হলেও, তা ছিল মুক্ত, প্রাঁজল, মর্মঘাতী ও সহজবোধ্য। কথ্যরীতিতে রচিত তাঁর কবিতায় ছিল ব্যঙ্গ, সংহত আবেগের প্রকাশ ও নিপূণ শিল্পকলার অভিপ্রকাশ। ১৯৪০-এর দশক থেকে তাঁর অকপট কাব্যভঙ্গী পরবর্তীকালের কবিদের কাছেও অনুগমনীয় হয়ে ওঠে। সমাজকে আদ্যন্ত প্রত্যক্ষ করে তবেই কবিতা রচনায় প্রবৃত্ত হতেন তিনি। ‘আদর্শ’ তাঁর কবিতাকে দিয়েছিল অভাবনীয় লোকপ্রিয়তা। বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কবির রাজনৈতিক চিন্তাধারায় পরিবর্তন আসে শেষ জীবনে। কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে আসেন বিতর্কের কেন্দ্রে। এপ্রসঙ্গে তিনি বলতেন, ‘আমি তো পার্টি ছেড়ে দিইনি।পাশে সরে দাঁড়িয়েছি।‘ সেসব আবার অন্য ইতিহাস,ভিন্ন সে প্রসঙ্গ। তবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর হিমালয়প্রতিম অবদান অখন্ডনীয়।

    অবশ্য তাঁকে সঠিক অনুধাবন করতে পেরেছেন তাঁরাই, যাঁরা তাঁর একনিষ্ঠ পাঠক। তাঁর কথা প্রসঙ্গে দেবেশ রায় কোনো এক খবরের কাগজে লিখেছিলেন, ‘’সুভাষদা জেদির মতো বলে এসেছেন, ধোপাদের কাপড় কাচার আওয়াজের কথা, বাংলা বাচনের বাঁকাচোরার কথা, মেয়েদের কথা বলার ধরন, বাংলা-কথার মধ্যে যে অনেক নিরর্থ অথচ প্রয়োজনীয় ধ্বনি থাকে, হয়ত সব ভাষাতেই থাকে, সেইগুলি ব্যাবহার করে কবিতার বাচন বদলে দিয়েছিলেন।’’

    কবি শঙ্খ ঘোষকে এক সাক্ষাৎকারে এক জনৈক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, ‘’১৯৮০-র দশকে ‘চইচই চইচই’ কাব্যগ্রন্থের একটা কবিতা ‘ভানুমতীর খেল’-এ মনে হয় আশ্চর্য সহজ বাচনে তিনি নিজের গোটা জীবন-দর্শনটাই বলে গেলেন- ‘বেঁচে থাকার প্রত্যহই পরব/যা দেখে তাই ভানুমতীর খেলা’- এক আশ্চর্য বিস্ময়বোধ। এই কি সংক্ষেপে সুভাষ মুখোপাধ্যায়? তার উত্তরে শঙ্ঘ ঘোষ বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই তা বলা যায়। জীবন-দর্শনই শুধু নয়, তাঁর কবিতার দর্শনও এতটাই। সে সঙ্গে কবিতাটির অন্য দুয়েকটি লাইনও স্মরণীয়, ‘আপনি মিলেছে যা/তাতেই খুশী, হোক না খুঁদকুঁড়ো/ হোক কিছু তার চোখের জলে ভেজা।’  সুভাষদার কবিতার ভেতরকার এই চোখের জলটা লক্ষ্য করতে না পারলে, তার অনেকটা স্বাদই আমরা হারাব।’’

    তিনি উপন্যাস লেখা নিয়েও অনেকসময় বিহ্বল এবং এলোমেলো হয়ে পড়তেন। তাঁর উপন্যাস ‘হাংরাস’, নামশুদ্ধু সমগ্র ভাবনা প্রায় কুড়ি বছর ধরে লালন করেছিলেন। ‘হাংরাস’ উপন্যাসেরই এক চরিত্রের মুখে তিনি বসিয়েছিলেন, ‘‘পুরুষ-মেয়ের সম্পর্কের কথাটা ঠিক জানি না, তাই উপন্যাস লেখা আমার হবে না।’’

    তাঁর, ‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা’ অথবা ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক/ আজ বসন্ত’ প্রভৃতি শাশ্বত পংক্তি বাংলায় একপ্রকার প্রবাদতুল্য বটে। তবে তাঁর আরও আরও কথা,পংক্তি, যা বারং বার প্রগাঢ় বেজে ওঠে- ‘আগ্নেয়গিরি পাঠালো যে এই রাত্রি/ গলিত ধাতুরা জমাট কখন বাঁধবে?/ব্যাবসায়ী মন মাহেন্দ্রক্ষণ খুঁজছে, টিকটিকি ডাকে, – বধির সে নিবন্ধ।’ আবার ‘অগ্নিকোন’-এর ‘মিছিলের মুখ’-এ বলছেন,- ‘অন্ধকার হাতে হাতে তাই গুঁজে দিই আমি/ নিষিদ্ধ এক ইস্তেহার,/ জরাজীর্ণ ইমারতের ভিৎ বসিয়ে দিতে/ ডাক দিই/ যাতে উদ্বেলিত মিছিলে একটি মথ দেহ পায়/ আর সমস্ত পৃথিবীর শৃঙ্খলমুক্ত ভালোবাসা/ দু’টি হৃদয়ের সেতুপথে/ পারাপার করতে পারে ’। কবির ‘রোম্যান্টিসিজম’ প্রতি মুহুর্তে ভেঙে ফেলছে প্রথাগত সুন্দরকে, তৈরী করছেন অক্ষরে অক্ষরে ঝনঝন শব্দ। তাঁর কবিতার শরীর-মন সন্ধের আধাঁরের নীল ঘেরাটোপে প্রণিধানে মূর্ত এখন, তবু কী স্পষ্ট তাঁর উষ্মা-ধ্বনি! —

     

    ‘‘একটি কবিতা লেখা হবে। তার জন্যে

    আগুনের নীল শিখার মতন আকাশ

    রাগে রী-রী করে, সমুদ্রে ডানা ঝাড়ে

    দুরন্ত ঝড়, মেঘের ধূম্র জটা

    খুলে খুলে পড়ে, বজ্রের হাঁকডাক

    অরণ্যে সাড়া, শিকড়ে শিকড়ে

    পতনের ভয় মাথা খুঁড়ে মরে

    বিদ্যুৎ ফিরে তাকায়

    সে আলোয় সারা তল্লাট জুড়ে

    রক্তের লাল দর্পণে মুখ দেখে

    ভস্মলোচন

    একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্যে।’’

    LEAVE A REPLY