রাজনীতির ঘেরাটোপে ‘বিরল’ হচ্ছে সম্প্রীতি ?!

    0
    1316

    মৌনী মন্ডল-

    ‘সম্প্রীতির নজীর গড়ল ঝাড়গ্রাম’ খবরটা পড়তে গিয়ে আমার সম্প্রতি একটা উপলব্ধি হল। উপলব্ধি ব্যাখ্যা করার আগে খবরে যেটা পড়লাম সেটা আগে বলি। পড়লাম “ঝাড়গ্রামের একই স্থানে মন্দির ও মসজিদ গড়ে উঠেছে। সেখানে একই সঙ্গে চলে আরাধনা। বিগত কয়েক বছর ধরে এটাই হয়েই আসছে এই গ্রামে। এটি একটি ‘বিরল’ দৃশ্য হলেও মনকে ভালো করে দেওয়ার মতো ঘটনা।” এইটুকু পড়েই আমি থামলাম। ‘বিরল’ শব্দটিতেই আমি থামি এবং উপলব্ধি ঘটে আমি যখন বড় হচ্ছি(৯০’এর দশক) সেই সময় আমাদের বাড়িতে দুধ বেচতে আসতেন এক বয়স্ক মহিলা, যাকে আমি ‘দিদা’ ডাকতাম, তিনি দুধ বেচতে এসে বাড়ির লোকজনের সাথে গালগল্প করে, অন্তত ১টি ঘন্টা না কাটিয়ে বাড়ি ফিরতেন না। নাম ছিল সাকিলা বিবি। এবং ঈদের দিন মা বাবা আমায় নিয়ে চলে যেত সাকিলা দিদার বাড়িতে। আমি খেতাম সেমাই আর মা বাবাকে দেখতাম পেট পুরে খাচ্ছে লাচ্চা পরোটা আর মাংস(গো)। তখন বঙ্গভঙ্গ দেখে ফেলেছে আমার পুর্বসূরীরা, ‘বাবরি মসজিদ’ কান্ড ঘটে গিয়েছে , হয়নি গুজরাট-গোধরা দাঙ্গা। ছোটবেলা থেকে এপর্যন্ত ব্যক্তিগত স্মৃতিকে যতদূর টেনে আনতে পারি সেখানে এমন কোনো সাম্প্রদায়িক ‘বিরল’ ঘটনার অস্তিত্বের অস্বস্তিতে আমায় পড়তে হয়নি, বরং সেখানে জাপ্টে রয়েছে ভালোবাসা-ভালোলাগার-আবেগের সহজাত, স্বাভাবিক, প্রকৃত আলিঙ্গন।

    পরে একটু বড় হয়ে দেখলাম ‘গুজরাট রায়ট’ । বুঝলাম ঠিক যে পরিমান আগুন ঐ স্থানে লেগেছে, তার থেকে বহু বহু গুন বেশি ‘রাজনৈতিক-অমানবিক’ আগুনের প্রকট লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ছে সমাজে, মননে। স্বাভাবিক প্রকৃতিগত সম্প্রীতির ঘটনাকে ‘বিরল’ তকমা সেঁটে দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে নিপুন দক্ষতায়। কারা যেন দেশটাকে অঘোষিত ধর্ম-অধুষ্যিত দেশ বানানোর জন্যে রে রে শব্দ করে তেড়ে আসতে শুরু করেছে!্সেই থেকে আমি দেখছি, দেখে চলেছি কিভাবে ধর্মের বিষধর সাপ ফণা তুলে রয়েছে, সুযোগ পেলেই বসাবে দাঁত। আমি বিড়বিড় করি ‘ধর্ম কি সহনশীলতার কথা বলেনি?’, বুঝতে শুরু করি দুষ্টের অট্টহাসি, তৈরী হয় দুশ্চিন্তা। কিন্তু ভয় আমি কখনও পাই নি। কারন আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি পৃথিবীতে যেমন দাঙ্গা প্রেক্ষিত আস্কারা দেওয়ার লোক রয়েছে, ঠিক তেমনই তয়েছে আমার বাবা-মা, সাকিলা দিদা অথবা ঝাড়গ্রামের বাসিন্দাদের মতো কিছু মানুষ, যাদের শরীরে-মনে-শিক্ষায়-রুচিতে-বিবেকে কখনই প্রাধান্য পাবে না রাজনীতি-অধর্ম-অশিক্ষা-কুরুচি-কুপ্রভাব।আমি স্বপ্ন দেখি না, আশা রাখি যেদিন সমগ্র পৃথিবী জুড়ে মানুষ সমবেত উচ্চারন করবে বব ডিলানের গান ‘It’s not dark yet’(এখনও অন্ধকার নয়) অথবা পিট সিগারের বহু চর্চিত ‘we shall over come’(আমরা কাটিয়ে উঠব), গম গম করবে পৃথিবীর বুক, ভেঙে পড়বে উদ্ধ্যত্ব-বর্বরতা। মাটি ছুঁয়ে নবজাগরন ঘটবে মানব-আত্মার।

     

    LEAVE A REPLY