বেগম রোকেয়া সাখায়াত হোসেন

    0
    182

                                                 

    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন,

    যেভাবে আপনি দেখেছেন……

     

    মৌনী মন্ডল : তাঁকে স্মরণ করতে গেলে একটা ৮ই মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের গাল ভরা তকমা লাগে না, তাঁর স্বকীয়তাই আমাদের বৈভব। তাঁকে ‘নারীমুক্তির পথিকৃৎ’ বলে যতটা সমীচীন বোধ হয়, ততটা ‘নারীবাদী’তে নয়। গোলাম মোস্তাফা, তাঁর ‘দুঃসাহসিকা’তে তাঁকে বলছেন, “ এ গভীর রাতে কে তুমি জননী, কল্যান-দীপ জ্বেলে/এই বাংলার নিদ-মহলার তিমির দুয়ারে এলে?/ মৃত্যু-মলিন আঁধার কক্ষে করিলে আলোকপাত,/ অভয়-মন্ত্র ফুকারি’ কন্ঠে দ্বারে দিলে করাঘাত?/ আকুল আবেগে ডাকিয়া কহিলে নিদ্রিত সন্তানে–/ওঠ ওঠ তোরা, ঘুমাস নে আর, জেগে ওঠ নব প্রানে!”

    ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দের জমিদার পরিবারে তিনি জন্মগ্রহন করেন। সেই সময়ে ইংরেজ শাসকের ‘বিভেদ করে শাসন কর’ নীতি অনুসরণের দরুন এবং ইংরাজী শিক্ষাবিরোধী মনোভাবের কারনে ভারতবর্ষের মুসলমান সম্প্রদায় ছিল হতদরিদ্র, কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে অনগ্রসর। তিনি এসবের মধ্যে বড় হচ্ছেন এবং ক্রমশ স্পর্শ করছে তাঁকে অবরোধবন্দিনী,নিগৃহিতা নারীসমাজ -তারই অজ্ঞানতা ও নির্জীবতার বেদনা তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল।তিনি তখন উদাত্ত বলতে চাইছেন, “তোমরা বসিয়া থাকো ধরা প্রান্ত-ভাগে/শুধু ভালবাসো।জানো না বাহিরে বিশ্বে গরজে সংসার…”।

    নারীবিদ্বেষী শপেনহর বলেছিলেন : one need only look at a woman’s shape to discover that she is not intended for ether to much mental or too much physical work(একজন মহিলার গড়নে দৃষ্টিপাত করা প্রয়োজন এটা বোঝার জন্যে যে, সে কখনই প্রস্তুত নয় অতিরিক্ত মানসিক ও শারীরিক পরিশ্রমের উদ্দেশ্যে)। কিন্তু রোকেয়া বলেছিলেন-“স্বীকার করি যে শারীরিক দুর্বলতা বশত নারীজাতি অপর জাতির সাহায্যে নির্ভর করে, তাই বলিয়া পুরুষ প্রভু হইতে পারে না।”the soul of a woman has something obscured and mysterious in it “–এই কথা তিনিও যে জানতেন, তা তাঁর ‘কুসুমের সৌকুমার্য্য হরিণের কটাক্ষ নিদ্রার মোহ ইত্যাদি তেত্রিশটি উপাদানে ললনা নির্মিত হইয়াছে ’ – উক্তিতেই বোঝা যায়।কিন্তু বিষয়টা হল তিনি নারীর সেই আত্মিক প্রকৃতির বিশ্লেষনে অগ্রসর না হয়ে সামাজিক জীবনের ক্রমভঙ্গতার দিকেই তিনি অগ্রসর হয়েছেন। ‘বাস্তবিক অলংকার দাসত্বের নিদর্শন বই আর কিছু নয়।’  নারির এই আত্মার দাসত্ব স্খলনের জন্য তিনি প্রস্তাব রেখেছিলেন : ‘ অলংকারের টাকা দ্বারা জেনানা-স্কুলের আয়োজন করা হোক।’  স্ত্রী শিক্ষার ব্যবস্থা যথাযোগ্য রুপে হলেই নারীর উন্নতি অনিবার্য, তার কুসংস্কার প্রিয়্‌, রক্ষনশীল অথচ ফ্যাশান-বিলাসী, আবেগপ্রধান প্রকৃতি, প্রকৃতিস্থতা পাবে;  complete equality with man makes her quarrelsome a positions of supremacy makes her tyrannical(পুরুষের সঙ্গে নারীর পূর্ন সমতা, নারীকে দ্বন্দবিলাসী, স্বৈরাচারী করে তোলে)– এই দুর্নাম যাবে ঘুচে,এই সহজ অথচ সুদৃঢ় বিশ্বাস তাঁর ছিল।সমকালীন ইতিহাসে দেখা যায় শুধু মুসলমান মেয়েই নয়, পুরুষদের মধ্যেও শিক্ষার তেমন প্রসার ঘটেনি। বাঙালী মুসলমান সমাজের পিছিয়ে পড়া ও প্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি রোকেয়াকে বিচলিত করে। সে সময় কলকাতায় অবস্থিত স্কুলগুলোর পরিসংখ্যানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, কলকাতায় মেয়েদের জন্যে বেথুন কলেজিয়েট স্কুল,ব্রাক্ষ্ম গার্লস স্কুল,ক্রাইস্ট চার্চ স্কুল,সাতটি উচ্চ বিদ্যালয় ও দুটি এম ই স্কুল,পাঁচটি ভার্নাকুলার স্কুল,৪১টি উচ্চপ্রাথমিক এবং ৪১টি নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। মুসলমান মেয়েদের জন্য নিম্ন প্রাথমিক উর্দুস্কুল ছিল ১৪টি ২৫টি কোরান স্কুল। বাংলাভাষী মুসলমান মেয়েদের জন্যে একটি স্কুলও ছিল না। নিজেকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা অথবা স্বামীর স্মৃতি সংরক্ষন বা বৈষয়িক উন্নতি – রোকেয়ার স্কুল প্রতিষ্ঠার পেছনে এর কোনো যৌক্তিকতা কাজ করেনি। মুসলমান মেয়েদের দুরবস্থা ও দুর্গতি তাঁকে আলোড়িত করেছে, মুসলমান মেয়েরা যেন তাদের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তারাও যেন মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নিজেদের শাণীত করে। এই আকাঙ্খা থেকেই রোকেয়া ১৯১১ এর ১৬মার্চ ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ স্থাপন করেন।মৃত্যুর পূর্বে তাঁর স্বামী সাখাওয়াত হোসেন মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার উন্নতি বিধানের জন্য স্ত্রী রোকেয়াকে ১০(দশ)হাজার টাকা দেন এবং তাকেই ট্রাস্টি মনোনীত করেন।

    ‘মতিচূর’ ১ম ও ২য় খন্ড,sultan’s dream,পদ্মরাগ,অবরোধবাসিনী,প্রভৃতি কয়েকখানা গ্রন্থে তাঁর জীবনের ঐকান্তিক স্বপ্ন অভিনব রুপে অবস্থান করছে। মতিচূর ১ম খন্ডে ‘বোরকা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন : “অবরোধের সহিত উন্নতির বেশী বিরোধ নাই…এই অবরোধ-প্রথা স্বাভাবিক নহে-নৈতিক…/বোরকা জিনিসটা মোটের উপরে মন্দ নহে,উন্নতির জন্য অবশ্য,উচ্চশিক্ষা চাই।এখন আমাদের শিক্ষয়িত্রীর অভাব।” তাঁর অকৃত্রিম বেদনার যে সাবলীল প্রকাশ,তা ‘নারীবাদী’ নয়, তা প্রকৃতই নারীমুক্তি ও কলুষহীন সমাজচিন্তারই বিস্তৃত সড়ক। সেই পথই ছুঁয়ে দেবে আনন্দলহরী।

    LEAVE A REPLY