দলিত থেকে থেকে সংখ্যালঘু এখন একটাই মন্ত্র ” চাচা আপন প্রাণ বাঁচা” !

খোঁজখবর, ওয়েবডেস্ক : ২৩শে মে ২০১৯ , টানটান উত্তেজনায় গোটা দেশ তখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ফলাফলের জন্য, বেলা গড়াতেই পরিষ্কার হতে শুরু করল ট্রেন্ড। যা ভাবা হয়েছিল তার থেকেও আশাতীত ফল করে দেশ জুড়ে গেরুয়া ঝড় তুলল পদ্ম শিবির। এমনকি বাংলাতেও প্রত্যাশার থেকেও ফল ভালো করেছে বিজেপি। কিন্তু সবই তো হল বিজেপি ও তার জোট সঙ্গী মানে এনডিএ ৩৫২ টা আসন পেল ৫৪২টার মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী ” সবকা সাথ সবকা বিকাশ” এর বুলিও আওড়ালেন। কিন্তু সুধী পাঠক আপনাদের একটু স্মরণ করিয়ে দিই সেই ভাইরাল হওয়া ছবিটার কথা যেটা কিছুদিন আগেও ঘুরেছে সোশ্যাল মিডিয়ায় ।

গোটা পিঠ জুড়ে লাল-লাল দাগ। যেন রক্ত দিয়েই আঁকা হয়েছে সেই দাগ। ছেলেটি দলিত। এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। নরেন্দ্র মোদীর রাজ্য গুজরাতে বসে সে একটি উচ্চবর্ণের মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল, এটাই ‘অপরাধ’! তথাকথিত উচ্চবর্ণের একদল চড়াও হলো তার উপর। একেবারে পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক মারধর চলল। সেই বীভৎস অত্যাচারের পর ওই কিশোরের ছবি প্রমাণ দিয়ে দেয়, দেশে এখন ঠিক কতটা ‘আচ্ছে দিন’! প্রমাণ দিয়ে দেয়, ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এরও।

মেহসানার ওই কিশোরের আদৌ উচ্চবর্ণের কোনও ছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল কিনা, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু খুনের হুমকি দিয়ে ওই ছাত্রকে বাকি পরীক্ষাতেও বসতে দেওয়া হয়নি। একদিকে শারীরিক অত্যাচার, আরেকদিকে শিক্ষায় কোপ। আজ যদি সেই অত্যাচারিত কিশোর বেপুথো হয় তার দায় কি রাষ্ট্রযন্ত্র নেবে ? এই প্রশ্নই এখন তুলছেন সমাজ বিজ্ঞানীরা।

আমরা যেন ভুলে না যাই ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী বাহিনী দেশজুড়ে যে গেরুয়া ঝড় তুলেছিল, তার অনেকটাই দলিতদের কাঁধে ভর করে। বিপুল সংখ্যক দলিত মানুষ পদ্ম চিহ্নে ভোট দিয়েছিলেন প্রকৃত ‘আচ্ছে দিন’র চাহিদায়। হয়ত তথাকথিত বোকা মানুষগুলো ভেবেছিলেন বৈষম্যহীন এক সমাজব্যবস্থা তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। পেট ভরে ডাল-রুটি , শিক্ষা, শুধু পিঠে দলিত স্ট্যাম্প পরে যাওয়া নয় তারা পাবেন একটা সন্মানজনক জীবন, পরিবর্তে পেয়েছেন একরাশ ঘৃণা, হিংসা, মারধর, স্বজনের মৃত্যু! শিক্ষাক্ষেত্রে-কর্মক্ষেত্রে সুযোগ হ্রাস, বৈষম্য নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁদের। উচ্চবর্ণের মানুষজন দলিতদের উপর লাগাতার অত্যাচার চালিয়ে গেলেও বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে পুলিশ তাঁদের বাঁচাতে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দিচ্ছেন দলিতদের, এমনই অভিযোগ। যে দলিত মানুষদের কাঁধে ভর করে ভোট বৈতরণীর অনেকটা পথই পেরিয়ে এসেছিলেন মোদী, সেই দলিতদেরই কার্যত কোণঠাসা করে দিতে চেয়েছে বিজেপি’র জাতপাত ভিত্তিক রাজনৈতিক কৌশল। আর ঠিক সেই কারণেই দলিত সমর্থনও হারাতে বসেছে বিজেপি। পুঞ্জীভূত অসন্তোষ ক্ষোভের সঞ্চার ঘটিয়েছে দলিতদের মধ্যে। নোট বাতিল, জিএসটি যেভাবে দেশের প্রত্যেকটি মানুষকে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে, তেমনি দলিতদেরও। জাঠ, মারাঠা, প্যাটেল সম্প্রদায়ের মানুষজন নিজেদের ভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে পথে নেমেছেন। ২০১৮ এর মে মাসের এক সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, দলিতদের সমর্থন হারাচ্ছে গেরুয়া শিবির। জাতপাতের নামে হিংসার ঘটনা ক্রমশ বাড়তে থাকায় প্রতিবাদে পথে নেমেছেন দলিতরা। সরকারি তথ্য থেকেই জানা গিয়েছে, শুধুমাত্র উত্তর প্রদেশেই হিংসার ঘটনা একলাফে ২৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে।

বিজেপি রাজত্বে শুধুই যে দলিতদের উপর শারীরিক অত্যাচার বেড়েছে তা নয়, থাবা বসানো হয়েছে তাঁদের রোজগারের উপরও। বিঘ্ন ঘটেছে তাঁদের পড়াশোনায়। হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দলিত গবেষক ছাত্র রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। কেন আত্মহত্যার মতো নির্মম পথ বেছে নিতে হয়েছিল রোহিত ভেমুলাকে? কেন আত্মঘাতী হয়েছিলেন জেএনইউ’র মুথুকৃষ্ণন জীবানন্দম? পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের পড়ুয়া হওয়ায় দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতেও তথাকথিত উচ্চবর্ণের ছাত্রদের কাছে বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বারবার। বাধ্য হয়ে তাঁরা অসম্মানের হাত থেকে বাঁচতে আত্মঘাতী হয়েছেন। রোহিত ভেমুলার স্কলারশিপের টাকা আচমকাই বন্ধ করে দিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাঁর মতোই বহু দলিত ছাত্রছাত্রী বিজেপি রাজত্বে আচমকাই হারিয়েছেন স্কলারশিপ। কোনও একটি দলিত পরিবারের মেয়ে বা ছেলে অনেক কষ্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা পর্যন্ত পৌঁছালেও অতিরিক্ত খরচের কারণে পিছিয়ে আসতে হয়েছে। আজ যখন দেশ জুড়ে গেরুয়া আবীরের ঝড় তখন আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া মেধাবী ভেমুলার মা-র চোখের জলের হিসাব নেয় কোন গৈরিক শিবিরের উচ্চবর্ণের নেতা।

বেকারদের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা নরেন্দ্র মোদী সরকারের শাসনকালে বেকারত্ব পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই চাকরি পাচ্ছেন না দেশের শিক্ষিত দলিতরাও। চিরাচরিতভাবে দলিতরা যে কাজ করে অর্থ রোজগার করে থাকেন, সেখানেও হস্তক্ষেপ ঘটেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলিতে গোরু বা মহিষের চামড়া ছাড়ানোর কাজ করেন দলিতরা। সেইসঙ্গে গবাদি পশু সংক্রান্ত ব্যবসার কাজেও যুক্ত তাঁরা। কিন্তু বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে সময় যত গড়িয়েছে, স্বঘোষিত গোরক্ষকদের উন্মত্ততা বেড়েছে। আচমকাই গোমাংসের ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। উনাতে গোচামড়া ছাড়ানোর ‘অপরাধে’ চার যুবককে নগ্ন করে ঘুরিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। সেই ঘটনার প্রভাব এতটাই মারাত্মক ছিল, খেত থেকে গোরুর মৃতদেহ সরাতে ভয় পেয়েছিল এক দলিত পরিবার। গুজরাটেরই বনসকণ্ঠে। ওঁরা ভেবেছিলেন, ফের যদি গোহত্যার ভুয়ো অভিযোগে নির্যাতিত হন! কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটে উলটো ঘটনা। কেন গোরুর দেহ তাঁরা সরাননি, এবার সেই ‘অভিযোগ’এ ওই দলিত পরিবারের উপর চড়াও হয় তথাকতিত উচ্চবর্ণের মানুষজন। বাদ যাননি অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূও। নির্বিচারে মারধর চলে তাঁর উপর। দরবার সম্প্রদায়ের কমপক্ষে দশ জনের বিরুদ্ধে দায়ের হয় অভিযোগ। অভিযুক্তরা কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কোনও ক্ষেত্রেই হয়নি। ব্যতিক্রম হয়নি এটিও। বিজেপি সরকারের গতিমুখ কোনদিকে সেটা এই সমস্ত ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ায় গাফিলতি থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সাহারানপুরের স্মৃতি এখনও তরতাজা। ভারতের সংবিধান প্রণেতা বিআর আম্বেদকারের জন্মদিন পালন করছিলেন সাব্বিরপুর গ্রামের দলিতরা। সেইসময় ঠাকুর রাজপুত সম্প্রদায়ভুক্ত লোকজন তাঁদের কলোনিতে ঢুকে পড়ে তাণ্ডব শুরু করে। ভাঙচুর করে একাধিক বাড়ি। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বাড়িঘর-দোকানপাট। সাহারানপুরের গ্রামগুলি মিলিয়ে ২৬শতাংশ দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। সাব্বিরপুরের চার হাজার বাসিন্দার মধ্যে দলিতরা ৬০০জন। নিত্যদিনই তাণ্ডবের আশঙ্কা নিয়েই জীবন নির্বাহ করতে হয় তাঁদের! সেই হিংসার ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রতনের কথায়, হাজারজনেরও বেশি পরপর বাইক নিয়ে ঢুকতে থাকে। হাতে তলোয়ার এবং লোহার রড। ঠিক যে জায়গা থেকে ঠাকুরদের বসতি শুরু হয়েছে, তার আগে পর্যন্ত সবকিছু তছনছ করে দেয় তারা। জখম হন একাধিক দলিত। প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের উপস্থিতিতেই এই তাণ্ডব চলে, অভিযোগ রতনের। বিজেপি’র উগ্র হিন্দুত্ববাদী মুখ যোগী আদিত্যনাথের পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকাই পালন করবে তা নিয়ে একপ্রকার নিশ্চিতই দলিতরা।

দলিত আন্দোলনের কর্মী রাম কুমার স্পষ্টতই অভিযোগ করেছেন, বিজেপি ভোট একত্রিত করতেই এসব চক্রান্ত। কখনও দলিত-মুসলিম সংঘর্ষ বাঁধাচ্ছে, কখনও দলিত-রাজপুত বিবাদ। ‘আচ্ছে দিন’র কাল্পনিক ছবি এঁকে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের নিজেদের দিকে টেনেছিল বিজেপি, কিন্তু বাস্তবে নিজের কফিনে গেরুয়া বাহিনী নিজেই পেরেক গেঁথেছে।
মালদহের সইদপুর গ্রাম থেকে রাজস্থানে কাজ করতে গিয়েছিলেন মহম্মদ আফরাজুল । দু’বছর আগে সেখানে তাঁকেহত্যা করা হয়। সেই হত্যার ঘটনার কথা এখনও ভোলেনি মালদহ জেলার মানুষ। এই জেলার বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের রুটিরুজি নির্ভর করে অন্য রাজ্যে গিয়ে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করার ওপর। সেরকমই একজন নির্মাণ শ্রমিক ছিলেন মহম্মদ আফরাজুল । ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করার পর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এই গোটা ঘটনাটির ভিডিও করা হয়েছিল। সেই ভিডিওতে উঠে এসেছিল, কীভাবে মৃত্যুর আগে হাতজোড় করে তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করছিলেন মহম্মদ আফরাজুল“ভিডিওটি এখনও রয়েছে। এই গ্রামের মানুষ এখনও ভিডিওটি দেখতে পারে। আমি জানি না সে কী ভুল করেছিল। শুধু মনে হয়, স্রেফ তার ধর্মের জন্যই তাকে খুন করে ফেলা হল”, এক কামরার ঘরে বসে বলছিলেন আফরাজুলের স্ত্রী গুলবাহার বিবি। তাঁর চোখে তখন জল। তাঁর পাশেই বসেছিল তাঁদের কনিষ্ঠ কন্যা হাবিবা এবং তাঁর নাতি-নাতনিরা।
বলতে পারেন উচ্চবর্ণের মেয়ের সঙ্গে ভালোবাসা করা ওই কিশোর , ভেমুলা বা আফরজুলরা কি অপরাধ করেছিল, যার ফলে জীবন দিয়ে তাদের মূল্য চোকাতে হল। হয়ত আফরাজুলের স্ত্রী গুলবাহার বিবির নীরবে ফেলা চোখের জলেই দলিত বা সংখ্যালঘুদের অনেক না বলা কথার উত্তর লুকিয়ে আছে।