রাজীব হত্যার ২৮ বছর !

 

খোঁজখবর, ওয়েবডেস্ক: ১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবর মা ইন্দিরা গান্ধী নিজের দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হওয়ার দিনই মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে তিনি দেশের কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রীরূপে কার্যভার গ্রহণ করেন। ১৯৮৯ সালের ২রা ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে পরাজয়ের পর পদত্যাগ করার আগে পর্যন্ত তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনীতিতে পদার্পণের পূর্বে রাজীব ছিলেন ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের এক পেশাদার বিমানচালক। কেমব্রিজে থাকাকালীন ইতালীয় বংশোদ্ভুত সোনিয়া মাইনোর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং পরে ১৯৬৮ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। মা দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও, ১৯৮০ সালে কনিষ্ঠ ভ্রাতা সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত রাজীব রাজনীতি থেকে শত হস্ত দূরেই ছিলেন। পেশাদার পাইলট রাজীব ভালোবাসতেন নীল আকাশে উড়ান নিয়ে পাড়ি দিতে। ১৯৮৪ সালে অপারেশন ব্লু স্টারের প্রতিক্রিয়ায় আততায়ীর হাতে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হলে জাতীয় কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ রাজীবকেই দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেন । ১৯৮৪ সালে তাঁর নেতৃত্বে কংগ্রেস সংসদের ৫৪২টি আসনের ৪১১টিতে জয়লাভ করে। এই জয় ছিল ভারতীয় সংসদে কংগ্রেসের সর্বকালের রেকর্ড

তবে মৃত্যুর ২৮ বছর পরেও ২০১৯ এর ২১ মে তে দাঁড়িয়ে আজও রাজীব হত্যা নিয়ে উঠে আসছে এক ঝাঁক প্রশ্ন। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর বিশেষ নিরাপত্তা বলয় কেন সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল? রাজীব গান্ধীর হত্যা হয়েছিল ১৯৯১ সালের ২১ মে। তার ঠিক আগের দিন এনএসজি কভার ফের ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা। অথচ তাঁর উপরে হামলা হতে পারে তার খবর বেশ কয়েকমাস আগে থেকে এসেছিল। রাজীবের নিরাপত্তার দায়িত্ব বিশেষ নিরাপত্তারক্ষীদের হাত থেকে সরিয়ে দিল্লি পুলিশের হাতে দিয়ে দেওয়া হয়। যখন কারও উপরে হামলার পূর্বাভাস থাকে, সেইসময়ে এভাবে নিরাপত্তা বদলে দিল্লি পুলিশের হাতে কীভাবে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই । , রাজীবের উপরে হামলা হতে পারে তা আন্তর্জাতিক এজেন্সি যেমন জানিয়েছিল, তেমনই প্যালেস্তাইন থেকেও সতর্ক করা হয়েছিল।
প্রথম ও প্রধান প্রশ্ন ভিডিও কোথায় গেল শ্রীপেরাম্বেদুরে যেখানে রাজীব নিহত হন সেখানে তিনি পৌঁছনোর আগে ভিডিও তোলা হয়। তিনি পৌছনোর পরও ভিডিও তোলা হয়। সেই ভিডিও কোথায় গেল? সেই ভিডিওর খোঁজ আজও মেলেনি। সেটাকে ইচ্ছে করে চেপে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন অনেকেই। আরও দাবি, ইন্টেলিজেন্সের এক আধিকারিকই ভিডিওটি চেপে দেয়। বরং এক সাংবাদিক এই মামলায় আইবিকে অনেক সাহায্য করেছেন। সিআইএ নয় এলটিটিই, জানায় র’ রাজীব হত্যার পর র’ এর তরফ থেকে জানানো হয় যে এলটিটিই নয় সিআইএ এই হামলার পিছনে রয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকেও জানানো হয় ঘটনায় জড়িত সিআইএ।
রাজীব গান্ধী শ্রীপেরামবুদুর শহরের জনসভাস্থলে পৌঁছান রাত ১০টায়। আর তার হত্যাকারী ধানু পৌঁছায় দুই ঘন্টা আগে, রাত ৮টায়। তারিখ ১৯৯১ সালের ২১শে মে। ধানু ছিল শ্রীলংকার লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই) বাহিনীর আত্মঘাতী স্কোয়াডের সদস্য। সে শ্রীলঙ্কা থেকে নৌ-পথে দুই মাস আগে এল টি টি ই প্রধান ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের নির্দেশে তৎকালীন মাদ্রাজ (এখনকার চেন্নাই) শহরে আসে রাজীব গান্ধীকে হত্যা করার জন্য।
বিরোধী দলের নেতা থাকাকালীন ১৯৯০ সালে সানডে ম্যাগাজিন এর ২১শে আগস্ট সংখ্যায় রাজীব গান্ধী একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন। সেই সাক্ষাৎকারে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরবর্তী নির্বাচনে যদি তিনি প্রধানমন্ত্রীত্ব পান তাহলে শ্রীলঙ্কায় আবার ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানো হবে। এই সাক্ষাৎকার প্রকাশ হবার পরপরই লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম মরিয়া হয়ে উঠে রাজীব গান্ধীকে হত্যা করার জন্য । এল টি টি ই হিসাব করে দেখেছিল যে রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস ক্ষমতায় আসলে ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী এসে যোগ দিবে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর সঙ্গে । কঠিন হয়ে যাবে তাদের যুদ্ধ।
এলটিটিই ঠিক করে যে নির্বাচন প্রচার চলাকালীন সময়ে রাজীব গান্ধীকে হত্যা করতে হবে কারণ এ সময়ে তিনি বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে নিরাপত্তা পাচ্ছেন। আবার প্রধানমন্ত্রী হলে গেলে তাকে ঘিরে শক্ত নিরাপত্তা বলয় মুড়ে ফেলা হবে তখন কাঙ্খিত সুযোগ নাও আসতে পারে ; তখন আর তাকে সহজে হত্যা করা যাবে না।

১৯৯০ সালের নভেম্বর মাসে এলটিটিই নেতা প্রভাকরণ তার চার বিশস্ত যোদ্ধা বেবী সুব্রামানিয়াম, মুরুগান, মথুরাজা এবং শিভারাসান কে নির্দেশ দেন রাজীব গান্ধীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে ফেলার। বেবী সুব্রামানিয়ামের মাদ্রাজ (এখনকার চেন্নাই) শহরে একটা প্রিন্টিং প্রেস ছিল। সেই সুত্রে সে ইন্ডিয়ান তামিলদের মধ্যে এলটিটিই এর এজেন্ডাগুলো ছড়াত এবং সহানুভুতি আদায় করত। মুরুগান ছিল একজন গেরিলা প্রশিক্ষক এবং বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। মুরুগান মাদ্রাজে বসবাসকারী তিন তামিল-আরিভু, ভাগ্যনাথান এবং তার বোন নালিনীকে দলে ভিড়ায়। এই তিনজনই আগে ত্থেকেই এলটিটিইর প্রতি সহানুভুতিশীল ছিল। আরিভুর কম্পিউটার বিজ্ঞানে ডিপ্লোমা ছিল এবং সে বোমা বানানোতে পারদর্শী ছিল। সুব্রামানিয়াম তাদেরকে বুঝায় যে রাজীব গান্ধীর পররাষ্ট্রনীতির কারণেই শ্রীলঙ্কায় তামিলদের এতো খারাপ অবস্থা।
অবশেষে সেই ভয়ঙ্কর দিন রাজীব গান্ধী ঠিক ১০টায় এসে পৌঁছান। সমর্থক পরিবেষ্টিত হয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান। অনেক সমর্থক তাকে মালা পরিয়ে দিতে থাকে। একসময় ধানুও এগিয়ে যায়। আনুসয়া কুমারী কি মনে যেন ধানুকে বাঁধা দেন। রাজীব গান্ধীর নজর পরে সেই দিকে। তিনি আনুসয়া কুমারীকে ইশারা করেন ধানুকে আসতে দিতে। আনুসয়া কুমারী সরে দাঁড়ান, ধানু রাজীব গান্ধীর কাছে পৌঁছে তাকে মালা পরিয়ে দেয়। একটু দূর থেকে এর ছবি তুলে হারিবাবু। মালা পরিয়ে দিয়ে ধানু রাজীব গান্ধীকে প্রণাম করার জন্য নিচু হয় এবং পোষাকের নিচে বাধা ৭০০ গ্রাম ওজনের আরডিএক্স ভর্তি বেল্টটি ফাটিয়ে দেয়। বিস্ফোরণের আঘাতে রাজীব গান্ধীর দেহ দুই মিটার দূরে ছিটকে যায়, মৃত্যু হয় তাৎক্ষণিক। ধানুর শরীরও ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। মাথা যেয়ে পরে ২৪ মিটার দূরে। আরও মারা যায় চৌদ্দজন মানুষ যার মধ্যে হারিবাবু একজন। হারিবাবু হয়তো শুধু জানতো ধানু প্রণাম করে চলে আসবে। হারিবাবুর প্রাণ চলে যায় বিস্ফোরণের আঘাতে, কিন্তু তার ক্যামেরায় প্রাণ থেকে যায়। র কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা পরে সেই ক্যামেরার ফিল্ম ডেভেলপ করে বিস্ফোরণের ঠিক আগের  মুহূর্তের কয়েকটা ছবি পায়।