৪২ এ ২২ এ কোন অশনিসংকেত !

খোঁজখবর, ওয়েবডেস্ক : সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে প্রধান প্রশ্ন ছিল নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি আবার ক্ষমতায় ফিরবে কিনা! আর তারপরেই যে প্রশ্ন নিয়ে দেশজ মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়েছে, তাহলো বিজেপি কি পশ্চিম বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শক্ত দুর্গে ফাটল ধরাতে পারবে?

২৩শে মে দুই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের সামনে — আগামী পাঁচ বছর মোদীর বিজেপি সরকার ভারতের ভাগ্য বিধাতা, আর মমতার দুর্গ দখল করতে না পারলেও বড় ফাটল ধরিয়েছে বিজেপির গৈরিক বাহিনী।

এবারের নির্বাচনে মোদী এবং বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে প্রচুর জনসভা করেছেন — ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী এই রাজ্যে, এমনকি বিধান সভা নির্বাচনের আগেও, এতো জনসভা করেননি। আর প্রত্যেকটি জনসভায় মোদী মমতাকে ‘স্পিডব্রেকার দিদি’ বলে কটাক্ষ করেছেন। বলেছেন, ‘আপনার জামানা শেষ হয়ে আসছে।’

কিন্তু সারা দেশে যখন মোদী সুনামি, পশ্চিমবঙ্গে মমতা যে ভাবেই হোক না কেন, নিজের জমি অনেকটাই ধরে রাখতে পেরেছেন। অর্ধেকের বেশি আসন তাঁর দলের দখলে। তাই সেই অর্থে উনি সত্যি ‘স্পিডব্রেকার’। এমনকি গৈরিক ঝড় এতটাই তীব্র ছিল যে আমেথির মত কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটিতেও বিজেপির স্মৃতি ইরানির কাছে পরাজিত হয়েছেন স্বয়ং রাহুল গান্ধী।

তবে মোদীর বিরুদ্ধে মমতা যত বড় গলা করে বলেছিলেন ‘৪২ এ ৪২’, অর্থাৎ রাজ্যের সবকটি লোকসভা আসনে তৃণমূলের জয় হবে, তা আজকের ফলের পরে খুবই ঠুনকো লাগছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কথায় মনে হচ্ছে, খানিকটা হলেও আত্মতুষ্টিতে ভুগছিলো তৃণমূল কংগ্রেস। বলা বাহুল্য, বিজেপি’র অভাবনীয় সাফল্যের গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির জন্য অপরিসীম – মূলত তিন কারণে।

* বাংলা ভাগ ধর্মের ভিত্তিতে হলেও ১৯৪৭-এর পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলো কোনদিন মাটি পায়নি। হিন্দুসভার প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী একজন বাঙালি, কিন্তু তার দল অথবা পরে ভারতীয় জনসংঘ অথবা বিজেপি, কেউই পশ্চিমবঙ্গে কিছু করতে পারেনি।

প্রথমে কংগ্রেস (১৯৪৭-৭৭), তারপর সিপিএমএ’র নেতৃত্বে বামফ্রন্ট (১৯৭৭-২০১১), এরপর ২০১১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সবাই বলিষ্ঠভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি করেছে, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বারবার ওঠে মুসলিম তোষণের অভিযোগ।

বিজেপি এতগুলো লোকসভা আসন জিতে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতার জন্য শুধুমাত্র জোরালো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে তাই নয়, তার চেয়েও বেশি হলো এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে আবার ধর্মীয় রাজনীতির গৈরিক পতাকার ছড়াছড়ি দেখা যাবে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষও ভারতের রাজনৈতিক নকশায় একটা ব্যতিক্রমী রাজনীতির জন্ম দিয়েছিল। বামপন্থী আদর্শের পেছনে বাংলার একটা আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল, পশ্চিমবঙ্গ পরিচিত হয়ে উঠেছিল ভারতের ‘লাল দুর্গ’ হিসেবে।

২০১১ তে পরিবর্ত্নের ঝড়ে তৃণমূল সেই দুর্গ গুড়িয়ে দিলেও বাংলা একটা আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় বজায় রাখে তার আঞ্চলিকতার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই আলাদা জায়গাটা নিয়ে নিয়েছে বিজেপি। ১৯৭৭ এর পর এই প্রথম বাংলায় কোনো জাতীয় দল এতটা জমি দখল করতে পেরেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ”এটা পশ্চিমবঙ্গের জন্য একটা বড় বিপর্যয়”। ,

এবারের নির্বাচনে যেভাবে বিজেপি-তৃণমূল সংঘর্ষ ঘটেছে, বুথে বুথে বোমা-বন্দুক চলেছে, যে ভাষায় মোদী আর মমতা একে অপরকে আক্রমণ করেছেন, বলাবাহুল্য তাতে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংঘাত আরো বাড়বে।

বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ্ বারবার বলেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসলে আসামের কায়দায় পশ্চিমবঙ্গেও নাগরিক পঞ্জি (ন্যাশনাল রেজিস্টার ফর সিটিজেনস বা এনআরসি) করা হবে — যার উদ্দেশ্য বাংলাদেশ থেকে আসা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা’ এবং তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া।

আসামে এ নিয়ে নাগরিক পঞ্জির খসড়ায় (ড্রাফট এনআরসি) প্রায় ৪০ লাখ বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের নাম বাদ পড়েছে, প্রায় ৪০ জন আত্মহত্যা করেছেন।

মমতা প্রথম থেকে বলেছেন, তার রাজ্যে এনআরসি করতে দেয়া হবে না। এখন বিজেপি আর কেন্দ্রীয় সরকার তা করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার দিকে এগোবে—এমনটা অনেকেই মনে করছেন।
গ্রামবাংলার তৃণমূল-বিরোধী মানুষেরা হয়তো তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে সুরক্ষার স্বার্থে বেছে নিয়েছেন বিজেপিকে, যেখানে বামফ্রন্ট কিংবা কংগ্রেস তাঁদের নেতৃত্ব দিতে পারছিল না। যেহেতু বাংলায় রাজনীতি সংক্রান্ত লড়াইয়ের তীব্রতা অনেক বেশি, তাই সর্বভারতীয় দল হিসেবে বিজেপিই হয়ে উঠেছে তৃণমূল-বিরোধীদের স্বাভাবিক পছন্দ। এর সঙ্গে আছে প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন। সংখ্যালঘুরা সাধারণ ভাবে তৃণমূলের পক্ষেই ছিলেন। সেই অঙ্কে সংখ্যাগুরুদের একটা বড় অংশ এ বার সমর্থন করেছেন বিজেপিকে। আর উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জায়গায় সংখ্যালঘুদের ভোট বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং তৃণমূলের মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার সুবিধেটাও পেয়েছে বিজেপি।
২৩ তারিখ ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পরেই গত শনিবার দলের কোর কমিটির বৈঠক ডাকেন তৃণমূল সুপ্রিমো, স্বাভাবিক ভাবেই সেই বৈঠকে লোকসভা ভোটের ফলাফল নিয়ে ব্যাপক কাঁটাছেড়া হয়। সাংগঠনিক রদবদলও করেছেন নেত্রী। কিন্ত ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। ২০২১ শে রাজ্যে বিধানসভার নির্বাচন তাই চোরা কাঁটার যন্ত্রণা যে থেকেই যায়।