ইতিহাস আজও কথা বলে হুগলীর গড় মান্দারনে

অর্পিতা লাহিড়ী

” ঘরের কাছে আরশি নগর, সেথা পড়শি বসত করে” তবে বহু ব্যয় করে বহু ক্রোশ পরিক্রমা করে এলেও নজর এড়িয়ে যায় পড়শি পর্যটন কেন্দ্রটি, নাম তার গড় মান্দারন। যুগপুরুষ শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংশ দেবের পুণ্য জন্মভূমি কামারপুকুর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার গড় মান্দারন। কামারপুকার, জয়রামবাটির সঙ্গে গড় মান্দারন জুড়ে নিলে দিব্যি একদিনের সুন্দর ছোট্ট ছিমছাম ট্যুর হতে পারেই।
গড় মান্দারনের সঙ্গে জুড়ে আছে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম। ‘‌দুর্গেশনন্দিনী’‌ উপন্যাসের পটভূমি গোঘাটের গড় মান্দারন পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে এখন রাজ্যের পর্যটনে নতুন দিশা দেখাচ্ছে।
সাহিত্য সম্রাটকে মুগ্ধ করেছিল গড় মান্দারন বঙ্কিম রচনাবলীতে তার উল্লেখও মেলে
“যে পথে বিষ্ণুপুর প্রদেশ হইতে জগৎসিংহ জাহানাবাদে প্রত্যাগমন করিয়াছিলেন, সেই পথের চিহ্ন অদ্যাপি বর্তমান আছে। তাহার কিঞ্চিৎ দক্ষিণে মান্দারণ গ্রাম। মান্দারণ এক্ষণে ক্ষুদ্র গ্রাম, কিন্তু তৎকালে ইহা সৌষ্ঠবশালী নগর ছিল। যে রমণীদিগের সহিত জগৎসিংহের মন্দির-মধ্যে সাক্ষাৎ হয়, তাঁহারা মন্দির হইতে যাত্রা করিয়া এই গ্রামাভিমুখে গমন করেন।” গড় মান্দারনে নাকি দুর্গও ছিল। দুর্গেশ নন্দিনী উপন্যাসে সাহিত্যসম্রাট দীর্ঘ বিবরণ দিয়েছেন গড় মান্দারনের। স্থানীয়রা আজও বিশ্বাস করেন মাটির তলায় গড় বা দুর্গের হদিশ মিলবে।

 


উল্লেখ্য, শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মস্থান কামারপুকুর থেকে মাত্র ৩ কিমি দূরে অবস্থান এই পর্যটনকেন্দ্রের। ১৯৮৭ সালে তত্‍কালীন বাম সরকার এই পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলে। আয়তন প্রায় ২০০ একর। এর মধ্যে প্রায় ৫৪ বিঘা ব্যক্তিগত সম্পত্তি রয়েছে। কিভাবে গড় মান্দারনকে আরও পর্যটক প্রিয় করে তোলা যায় তার চেষ্টা চালাচ্ছে রাজ্যের পর্যটন দফতর।
দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটকরা এই কেন্দ্রটিকে আরও সাজিয়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছেন। কারণ গড় মান্দারণের সঙ্গে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের নাম জড়িয়ে আছে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে এই গড়ের। গড় মান্দারনের একটি গাজি ও পীরের দরগা যা এলাকার মানুষের কাছে ‘‌বড় আস্তানা’‌ নামে পরিচিত। কথিত আছে এটি গৌড়ের অধিপতি হুসেন শাহর সেনাপতি ইসমাইল গাজির সমাধিবেদী।

হুগলী জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে এখানে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। প্রকৃতিই এখানে মুখ্য আকর্ষনীয়। শাল, পিয়াল, ইউক্যালিপটাস ও সেগুনে ঘেরা জঙ্গল। পিকনিকের সময় বাদ দিলে বাকি সময় প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ব হওয়ার এক বিশেষ সুযোগ। মাত্র ১৫ টাকা প্রবেশমূল্য দিয়ে গড়ে প্রবেশ করতে পারেন। সঙ্গে গাড়ি থাকলে পার্কিং এর জন্য আরো ৩০ টাকা। গ্রীষ্মের নিঝুম দুপুরে গড় মান্দারন যেন পর্যটকের জন্য দুই হাত বাড়িয়ে অপেক্ষা করে আছে। শাল, পিয়ালের জঙ্গলের মাঝেই প্রায় ১০০ সিড়ি ভেঙ্গে মাজার দর্শন আর উপরি পাওনা ঝিঁঝিঁর গান নির্জনতা ভালোবাসলে অবশ্যই ঘুরে আসুন গড় মান্দারন। তবে শীতকালে পিকনিক পার্টিদের দাপটে নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট হারিইয়ে ফেলে গড় মান্দারন।

দুরে পীর পাহাড়ে আছে গাজীপীরের সমাধি। গৌড় সেনাপতি হুসেন সাহর সেনাপতি ইসমাইল গাজী যিনি মানুষের কাছে পীর বাবা হিসেবে পরিচিত ছিলেন সেই পীর সাহেবের দরগা। একটি টিলার ওপর অবস্থিত এই দরগাটি। হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সবাই বাতি জ্বালে দরগায়।

কিভাবে যাবেন গড় মান্দারন! কোলকাতা থেকে জয়রামবাটী গামী বাসে চড়ে কামারপুকুর চটি। সেখান থেকে আবার রামজীবনপুর বাসে গড়মান্দারণ চটি নামতে হবে। আর ট্রেনে গেলে হাওড়া আরামবাগ লোকালে আরামবাগ নেমে বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে চড়ে কামারপুকুর চটি । সেখান থেকে বাসে গড় মান্দারন । তবে পর্যটকদের মনে রাখতে হবে গড় মান্দারনে কিন্তু কোন থাকার যায়গা নেই থাকতে হলে কামারপুকুর বা জয়রামবাটিতেই থাকতে হবে সেখান থেকে আসতে হবে গড় মান্দারন।